বিষাক্ত খাদ্য: বাংলাদেশের আইনসমূহের পর্যালোচনা

খাদ্যে বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহার বর্তমান সময়ে দেশের জনগনের মাঝে এক আতঙ্কের বিষয়। দ্রুত লাভের স্বার্থে কিছু ব্যবসায়ীরা মাছে ও দুধে ফরমালিন, ফলমূলে কার্বাইডসহ নানান বিষাক্ত কেমিক্যাল, সবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক, জিলাপি-চানাচুরে মবিল, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ডড্রিংস, জুস, সেমাই, আচার নুডুলস এবং মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রং, পানিতে ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই, লবণে সাদা বালু, চায়ে করাতকলের গুঁড়া, গুঁড়া মসলায় ভূষি, কাঠ, বালু, ইটের গুঁড়া ও বিষাক্ত গুঁড়া রং ব্যবহার করছে। ফলে কোনো খাবারই নিরাপদ নয়। এই বিশেষ দিকগুলো চরম উপেক্ষা করায় জনস্বাস্থ্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে।

বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা অসংক্রামক রোগের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৩ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অসংক্রামক রোগ। এ অঞ্চলে বছরে প্রায় ৭৯ লক্ষ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যায়। মানুষের মাঝে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যভাস। খাদ্যে ভেজালসহ নানা কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল শুধু বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্যও ক্ষতিকর। গবেষকরা এ অবস্থাকে নীরব গণহত্যা হিসেবে অবহিত করেছেন।

বাংলাদেশ সংবিধান ও জনস্বাস্থ্য:
দেশের সার্বিক সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ্য জাতি। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বাংলাদেশ সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে দিক নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) অনুসারে চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এবং অনুচ্ছেদ ১৮ (১) জনগনের পুষ্টিস্তর উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে।
একজনক মানুষের পরিপূর্ণ শারিরীক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্যের প্রয়োজন। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য বন্ধ করা সরকারের সংবিধানিক দায়িত্ব।

খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু রয়েছে সমন্বয়হীনতা:
খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষায় বাংলাদেশের সরকারের একাধিক সংস্থা দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের ৭টি মন্ত্রণালয় নিরাপদ ও মান সম্মত খাদ্য নিশ্চিতের সাথে সরাসরি জড়িত। এছাড়া বিভিন্ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরগুলোর উপরও বিভিন্ন দায়িত্ব সুপষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, মজুদ, বিপনন, বাজারজাতকরণ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য মান রক্ষার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, বানিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মৎস ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, কৃষি অধিদপ্তর, প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর, মৎস অধিদপ্তর, বিএসটিআই, বিসিএসআইআর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ সংস্থাগুলোর নীতিমালা, আইন ও কার্যপরিধিতে খাদ্য মান রক্ষা সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশকে বিভিন্ন আইনের অধীন আইন বাস্তবাস্তবায়নে সহযোগিতার বাধ্যকতা রয়েছে। খাদ্যের সাথে এ সকল মন্ত্রণালয়গুলোর সম্পৃক্ততা থাকলেও এ সংস্থাগুলোর একটির সাথে অন্যগুলোর সমন্বয় নেই। এ সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধ লাগামহীনভাবে বিপনন ও বাজারজাতকরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

খাদ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতিমালা:
বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৩, জাতীয় খাদ্য নীতি ২০০৬, পুষ্টিনীতিতে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, জাতীয় নারীনীতি, শিশুনীতি, ক্রীড়ানীতি, জাতীয় যুবনীতিতে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে পুষ্টিমান রক্ষায় নানা ধরনের নির্দেশনা রয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মহামান্য আদালতের নির্দেশনা
খাদ্যে রাসায়নিক, ভেজাল এবং ফরমালিন, কাপড়ে ব্যবহৃত রং ব্যবহারসহ নানা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্য উৎপাদন ও বাজারকরার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১ জুন এক রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট সরকারকে দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত (ফুড কোর্ট) স্থাপন এবং খাদ্য বিশ্লেষক ও খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগের আদেশ দিয়েছিলেন

আদালত তার রায়ে বলেছে, দেশের জনগণ অসুস্থ থাকিলে রাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনারই অগ্রগতি হইতে পারে না। এই সকল কারণে জনগণের সুস্বাস্থ্যের প্রতিবিধানকরণ প্রাধান্য পাইবার যোগ্য। কারণ ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তি জীবনের সুস্থতা ব্যতিরেকে প্রজাতন্ত্রের সকল প্রচেষ্টাই সম্পূর্ণ বিফল হইবে। অতএব, সংবিধানে বর্ণিত উপরোক্ত উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিশুদ্ধ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ অতি জরুরি।

২০১০ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট আবার একটি আদেশ দিয়ে প্রশাসনকে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করার নির্দেশ দেন।

খাদ্যের সাথে জড়িত বিভিন্ন আইনসমূহ :
নিরাপদ খাদ্য, ও খাদ্য মান রক্ষা ও বাজার মূল্য নিশ্চিতে বাংলাদেশে প্রায় ২৩ টি মতো আইন সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এ সকল আইনগুলো মানুষের খাদ্য উৎপাদন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মান নিয়ন্ত্রণে সাথে জড়িত। কতিপয় আইনগুলো বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পৃক্ত। মোবাইল কোর্টে আইন ২০০৯ মাধ্যমে নিম্নোক্ত বিভিন্ন আইনসমূহ প্রয়োগের বিধান রয়েছে।

এ আইনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০, বিষ আইন ১৯১৯, ক্যান্টনমেন্ট আইন ১৯২৪ (ধারা-৫৯, ২০৪, ২০৫), অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৫৬, কৃষিপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৬৩, কীটনাশক অধ্যাদেশ ১৯৭১, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪, বাংলাদেশ হোটেল ও রেষ্টুরেন্ট অধ্যাদেশ ১৯৮২, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ও টেস্টিং ইন্সটিটিউশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫, আয়োডিন অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ আইন ১৯৮৯, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন ২০০৯, ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন আইন ২০০৯, মৎস্য হ্যাচারি আইন, ২০১০, মৎস্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০, পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১, উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আইন ২০১২, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশু খাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন ২০১৩, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে

দন্ডবিধি ১৮৬০ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন
বাংলাদেশে দন্ডবিধির ২৭২ ও ২৭৩ ধারায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭২ ধারায় বিক্রির জন্য খাদ্য বা পানীয়তে ভেজাল মেশানোর দায়ে কোনো ব্যক্তিকে অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭৩ ধারায় ক্ষতিকর খাদ্য ও পানীয় বিক্রির অপরাধেও ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে। ওষুধে ভেজাল মেশানো বা ভেজাল মেশানো ওষুধ বিক্রির জন্য দন্ডবিধির ২৭৪ ও ২৭৫ ধারায় সর্বোচ্চ ছয় মাসের শাস্তির বিধান রয়েছে।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়। এ আইনের ২৫(গ) এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল মেশালে বা ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ বিক্রি করলে বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করলে অপরাধী ব্যক্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ১৪ বছর কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে বলে বিধান করা হয়। এ ছাড়া ক্ষতিকর প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রি বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন (যা মানুষের দেহের জন্য ক্ষতিকর) করলে অপরাধীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বা যেকোনো মেয়াদের কারাদন্ড দেওয়ার বিধান করা হয়।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের সাথে নিরাপদ খাদ্য আইন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন আইন সরাসরি সম্পৃক্ত। নিম্নে উক্ত আইনের বিষয়সমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩

খাদ্যাভ্যাস অসংক্রামক রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। নগরায়ান, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, বিজ্ঞাপনের কারণে মানুষের খাদ্যভাসের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে বাংলাদেশে অস্বাস্থ্যকর ও মানহীন খাবার, খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক ব্যবহার ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার Pure Food Ordinance 1959-কে অধিকতর শক্তিশালী করে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ প্রণয়ন করে। জনগনের খাদ্যমান রক্ষায় এ আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পারে। এ আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ হচ্ছে।

১. এ আইনের খাদ্য, নকল খাদ্য, নিরাপদ খাদ্য, নিরাপদ খাদ্য বিরোধী কাজ, ভেজাল খাদ্য, খাদ্য সংযোজন দ্রব্য, প্রক্রিয়াকরণ-সহায়ক দ্রব্যকে সুপষ্টভাবেক সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যা বিশুদ্ধ খাদ্য চিহ্নিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।
২. নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা প্রদানের নিমিত্তে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা পরিষদ নামে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পরিষদ গঠন করার নির্দেশনা রয়েছে।
৩. এ আইনের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে।
৪. নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণে খাদ্য উৎপাদন, আমাদনি, প্রক্রিয়াকরণ মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সহিত সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
৫. এ সংস্থা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের লক্ষ্যে খাদ্য পরীক্ষা, গবেষণা, মাননির্ধারণ, খাদ্যের মোড়কীকরণসহ নিরাপদ খাদ্যে নিশ্চিতের লক্ষ্যে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।
৬. নিরাপদ খাদ্যে নিশ্চিতে অন্যান্য সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয়ের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৭. এ আইনের অধীনে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণের সমন্বয়ে কারিগরি কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে।
৮. এ আইনে খাদ্যে বিষাক্ত দ্রব্যের ব্যবহার, তেজস্ক্রিয়, ভারী-ধাতু ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য বিপনন, নিম্নমানের খাদ্য উৎপাদন, শিল্প-কারখানার ব্যবহৃত তৈল, ভেজাল বা দূষণকারী খাদ্য রাখা, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য, মাত্রারিক্ত বৃদ্ধি প্রবর্ধক- কীটনাশক- বালাইনাশক ব্যবহার, খাদ্যে বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে এমন দ্রব্য, মোড়কীকরণ ব্যতীত খাদ্য, মিথ্যা বিজ্ঞাপন এবং সর্বোপরি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন খাদ্য আমদানী, বিক্রয়, বিপনন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৯. খাদ্য ব্যবসায়ীদের উপর নিরাপদ খাদ্যে নিশ্চিতের লক্ষ্যে কতিপয় দায়দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে।
১০. এ আইনের বাস্তবায়ন সহজতর করার লক্ষ্যে খাদ্য আদালত নামে পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নিরাপদ খাদ্য আইন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ আইনে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্যদ্রব্য নিষিদ্ধ এবং মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিতের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন খাদ্য ভেজালজনিত ক্ষতি হতে জনগণকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষন আইন ২০০৯

ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষন, ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্য প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে প্রণীত হয় বহুল প্রত্যাশিত “ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষন আইন ২০০৯”। এ আইনে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং মানহীন পণ্য বিক্রয়ের ফলে ক্রেতার আইনী প্রতিকার প্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে। এ আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে:
• ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামে জাতীয় একটি পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
• জেলা ও উপজেলায় ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন কমিটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এ আইনে খাদ্যের সাথে সম্পর্কিত ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ক্ষমতা হিসাবে প্রদান করা হয়েছে:
১. ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে এইরূপ সম্ভাব্য কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ,
২. কোন পণ্য বা সেবার নির্ধারিত মান বিক্রেতা কর্তৃক সংরক্ষণ হচ্ছে কিনা উহা তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
৩. পণ্যের বিক্রয় বা সরবরাহের ক্ষেত্রে ওজন বা পরিমাপে কারচুপি করা হচ্ছে কিনা তার তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণ;
৪. কোন পণ্য বা ঔষধের নকল প্রস্তুত, উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে কিনা এবং এর ফলে বিক্রেতা/উৎপাদক/ সরবরাহকারী দ্বারা ক্রেতা সাধারণ প্রতারণার শিকার হচ্ছে কিনা তার তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
৫. কোন আইন বা বিধির অধীন নির্দেশিত মতে কোন পণ্য বা ঔষধের মোড়কে উক্ত পণ্য বা ঔষধ উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার তারিখ, সঠিক ব্যবহার-বিধি ও পরিমাণ মুদ্রণ করা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
৬. মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোন খাদ্যপণ্য প্রস্তুত, উৎপাদন বা বিক্রয় করা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
৭. মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় এমন কোন প্রক্রিয়ায় কোন পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;
৮. কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন দ্বারা ভোক্তা সাধারণকে প্রতারিত করা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধানসমূহ:
১. কোন দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফ্যাক্টরী, কারখানা বা গুদামে ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কোন পণ্য বিক্রয় বা উৎপাদিত হচ্ছে কিংবা গুদামজাত করে রাখা হচ্ছে এইরূপ প্রতীয়মান হলে মহাপরিচালক বা অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা উক্ত দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফ্যাক্টরী, কারখানা বা গুদাম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবার জন্য নির্দেশ প্রদান করতে পারবেন।
২. কোন পণ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হলে মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, সমগ্র দেশে বা কোন নির্দিষ্ট এলাকায় এইরূপ পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শণ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার বা প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শর্তাধীন ঐ সকল কার্যক্রম পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশ জারী করতে পারবে।

পরিসমাপ্তি :
খাদ্য নিরাপত্তা ও মান রক্ষার সাথে সরকারের ৭ টি মন্ত্রণালয় এবং ২৩ টি আইন রয়েছে। এ সকল আইনের মাধ্যমে খাদ্যের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মান রক্ষা, বাজারজাতকরণ নিশ্চিত, মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এ লক্ষ্যে প্রয়োজন সকল মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরগুলোর সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। সকল মন্ত্রণালয়গুলোর লোকবল, বাজেট, ক্ষমতার সমন্বয় করা সম্ভব হলে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন বিষয় নয়। সরকারকে আংশিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে দূরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সমন্বিত করে কিভাবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায় এ বিষয়টি ভাবতে হবে।

About The Author

admin

Leave a Reply